আমাদের কথা

সংসদ থেকে সংঘ

কলকাতার এক ছোট্ট পাড়ার বুকে, যেখানে সকালের আলো গলির ভেতর দিয়ে চুঁইয়ে পড়ে, যেখানে বিকেলের আড্ডায় মেশে চায়ের গন্ধ আর হাসির শব্দ — সেখানেই জন্ম হয়েছিল একটি স্বপ্নের। সেই স্বপ্নের নাম সতীন সেন সংসদ

১৯৬৫ সালের কথা। তখন এই পাড়া ছিল অনেকটাই ছোট, মানুষজন ছিলেন কম, কিন্তু মনের প্রসার ছিল অনেক বড়। কয়েকজন তরুণ মিলে ভেবেছিলেন — শুধু নিজের জন্য নয়, একে অপরের জন্য বাঁচতে হবে। শুধু নিজের দুঃখ নয়, পাড়ার সকলের আনন্দ-বেদনাকে নিজের করে নিতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই গড়ে উঠেছিল সতীন সেন সংসদ — আমাদের ক্লাব, আমাদের ঘর, আমাদের পরিবার।

সতীন সেন — এই নামটি শুধু একটি ক্লাবের পরিচয় নয়। এটি একটি আদর্শের নাম। এমন একজন মানুষের স্মৃতি, যিনি বিশ্বাস করতেন মানুষই পারে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তাঁর সেই বিশ্বাসকে বুকে ধরে আজও আমরা এগিয়ে চলেছি।

বছরের পর বছর কেটে গেছে। পাড়া বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি এই সংঘের প্রতিশ্রুতি। দুর্গাপূজার সময় যখন ঢাকের বাদ্যি বাজে, যখন মায়ের মূর্তির সামনে সারি সারি প্রদীপ জ্বলে ওঠে — তখন পাড়ার প্রতিটি মানুষের মুখে যে হাসি ফোটে, সেই হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কালীপূজার রাতে আতশবাজির আলোয় যখন ছোট্ট শিশুর চোখ বড় বড় হয়ে যায় বিস্ময়ে — সেই মুহূর্তটুকু ধরে রাখার জন্যই তো আমরা সারা বছর পরিশ্রম করি।

কিন্তু আমাদের গল্প শুধু উৎসবের নয়।

সেই বছরের কথা মনে আছে, যখন পাড়ার একটি পরিবার হঠাৎ বিপদে পড়েছিল? বাড়ির কর্তার অসুস্থতায় সংসার টলমল। সেদিন সতীন সেন সংসদের সদস্যরা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন — কেউ হাতে ওষুধ নিয়ে, কেউ রান্না করা খাবার নিয়ে, কেউ শুধু পাশে বসে থাকতে। সেই মানুষটি পরে বলেছিলেন, "ওই দিন বুঝেছিলাম, পাড়া মানে শুধু পাশের বাড়ি নয় — পাড়া মানে পরিবার।"

রক্তদান শিবিরের দিন যখন সকাল থেকে লম্বা লাইন পড়ে যায়, যখন আঠেরো বছরের ছেলেটি প্রথমবার রক্ত দিতে এসে একটু ভয়ে কাঁপে — আর পাশ থেকে একজন প্রবীণ সদস্য হাতটা ধরে বলেন, "ভয় নেই বাবা, এই রক্ত কারো জীবন বাঁচাবে" — তখন যে অনুভূতি হয়, সেটা ভাষায় বোঝানো যায় না।

বৃক্ষরোপণের দিন যখন একটা ছোট্ট চারা গাছ মাটিতে পোঁতা হয়, তখন আমরা জানি — এই গাছ একদিন বড় হবে, ছায়া দেবে, আর আমরা হয়তো সেই ছায়ায় থাকব না। কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম থাকবে। তাদের জন্যই তো এই লাগানো।

স্বাস্থ্য শিবিরে যখন পাড়ার বৃদ্ধ মা চোখ পরীক্ষা করাতে আসেন এবং ডাক্তার বলেন, "সময়মতো ধরা পড়েছে, ভালো হয়ে যাবে" — সেই মায়ের চোখের জলটুকু, সেই স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু — এর জন্যই তো আমাদের এই আয়োজন।

আমাদের প্লে-স্কুলের ছোট্ট ছেলেমেয়েরা যখন প্রথমবার "অ আ ক খ" বলতে শেখে, যখন তাদের ছোট্ট হাত দিয়ে প্রথম রঙ আঁকে — সেই মুহূর্তে মনে হয়, আমরা শুধু একটি ক্লাব চালাচ্ছি না, আমরা একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছি।

বনভোজনের দিন যখন সবাই একসাথে বসে পাত পেড়ে খায়, যখন হাসি-মশকরায় মেতে ওঠে ছোট-বড় সবাই — তখন জাত-পাত, বয়স, পদমর্যাদা — সব ভেদ মুছে যায়। সবাই হয়ে যায় এক।

বছরের পর বছর ধরে আমাদের সদস্যরা এসেছেন, গেছেন। কেউ কেউ চলে গেছেন চিরতরে। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি রয়ে গেছে এই সংঘের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি উৎসবে, প্রতিটি সেবায়। তাঁরা চলে গেলেও তাঁদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা আমাদের পথ দেখায়।

আজ সতীন সেন সংসদ শুধু একটি ক্লাব নয়। এটি একটি অনুভূতি। এটি সেই উষ্ণতা, যা শীতের রাতে কারো দরজায় আলো জ্বালিয়ে রাখে। এটি সেই সাহস, যা বিপদের দিনে কাউকে একা থাকতে দেয় না। এটি সেই আনন্দ, যা উৎসবের দিনে গোটা পাড়াকে এক করে দেয়।

আমরা বিশ্বাস করি — মানুষ যখন একসাথে থাকে, তখন কোনো দুঃখই অসহ্য নয়, কোনো আনন্দই অপূর্ণ নয়।

সতীন সেনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে — আজও আমরা এক। আগামীতেও থাকব।

এটাই আমাদের কথা। এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি।

নিবন্ধিত নাম
Satin Sen Sangha
পুরনো নাম
Satin Sen Sansad
নিবন্ধন নং
S0000504

আমাদের পরিচালন সমিতির সাথে পরিচিত হন।

সদস্যবৃন্দ →